শুক্রবার, ০৩ Jul ২০২৬, ০৬:৩৬ অপরাহ্ন
তথ্য ও প্রযুক্তি ডেস্ক, নগরকন্ঠ.কম : করোনাভাইরাস মোকাবিলায় বায়োকেমিস্ট ও মলিকুলার বায়োলজিস্টদের অন্তর্ভুক্তির প্রস্তাব করেছে গ্র্যাজুয়েট বায়েকেমিস্ট অ্যাসোসিয়েশন (জিবিএ)।
শুক্রবার সংগঠনটির এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ দাবি জানানো হয়। সংগঠনের সভাপতি প্রফেসর ড. হোসেন উদ্দিন শেখর ও সাধারণ সম্পাদক আবু সাঈদ মুহাম্মদ শামীম সংগঠনের পক্ষ থেকে বিজ্ঞপ্তিতে এ বিষয়ে বিস্তারিত তুলে ধরেছেন। এছাড়া সরকারকে করোনা মোকাবিলায় সহযোগিতার প্রস্তাব দিলেও তার জবাব পাননি বলে তারা অভিযোগ করেন।
জিবিএ নেতৃদ্বয় বলেন, করোনাভাইরাস বর্তমান বিশ্বে একটি আতংকের নাম। ইতোমধ্যে প্রায় ২১৫টি দেশে এই রোগ মহামারি আকারে দেখা দিয়েছে। সারা বিশ্বে প্রায় ২৭ লাখ মানুষ এই রোগে আক্রান্ত হয়েছে যার মধ্যে প্রায় ১ লাখ ৯০ হাজার মানুষ ইতোমধ্যেই মৃত্যুবরণ করেছেন। এই ভাইরাস দ্রুত এর জিনোমে পরিবর্তন বা মিউটেশন ঘটায়, এর জন্য ভ্যাকসিন আবিষ্কার করতে বিজ্ঞানীরা হিমশিম খাচ্ছে।
তারা বলেন, ভ্যাকসিন আবিষ্কারের আগ পর্যন্ত প্রতিরোধই এই রোগের হাত থেকে বাঁচার একমাত্র কার্যকর উপায় বলে বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত। বিগত ৮ মার্চ বাংলাদেশে প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হলেও বর্তমানে এর সংখ্যা চার হাজার ছাড়িয়ে গেছে এবং মৃতের সংখ্যাও ১৩০ ছাড়িয়েছে। পর্যাপ্ত সংখ্যক টেস্ট করে আক্রান্ত ব্যক্তিদের শনাক্ত ও আইসোলেশনের মাধ্যমে কয়েকটি দেশ করোনা প্রতিরোধে সফলতা পেয়েছে।
কিন্তু এক্ষেত্রে আমরা এখনো অনেক পিছিয়ে উল্লেখ করে তারা বলেন, এর অন্যতম প্রধান কারণ হলো টেস্ট বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ভুল। বিশ্বব্যাপী আরটি-পিসিআর হলো করোনা শনাক্তকরণে গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড মেথড। এটি এমন একটি প্রযুক্তি, যা সাধারণ চিকিৎসা পদ্ধতিতে ব্যবহৃত হয় না। এই মলিকুলার প্রযুক্তিটি বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে আরএনএ/ডিএনএ নিয়ে গবেষণার কাজে প্রতিনিয়তই ব্যবহৃত হয় এবং সাধারণত বায়োকেমিস্ট্রি অ্যান্ড মলিকুলার বায়োলজি, মাইক্রোবায়োলজি ও জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ছাত্র ও শিক্ষকরা এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে থাকেন।
তারা বলেন, এসমস্ত বিভাগের ছাত্র ও শিক্ষকগণের এই প্রযুক্তি সম্পর্কে তত্ত্বীয় এবং প্রায়োগিক উভয় প্রকার জ্ঞান আছে। বিশ্বব্যাপী করোনা শনাক্তকরণে এই সকল বিশেষজ্ঞদের কাজে লাগানো হলেও বাংলাদেশ এর ব্যতিক্রম। এদেশের বেশির ভাগ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে এই প্রযুক্তি এবং বিশেষজ্ঞ থাকলেও এখন পর্যন্ত তাদেরকে কাজে লাগানো হয়নি। এমনকি ইতোপূর্বে এই কাজে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কীভাবে সহযোগিতা করতে পারে তা উল্লেখ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেয়া হলেও কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।
যদিও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োকেমিস্ট্রি অ্যান্ড মলিকুলার বায়োলজির ১০ জন প্রাক্তন ছাত্র/ছাত্রী (বর্তমানে বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত) স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে ঢাকা, রাজশাহী, রংপুর, ফরিদপুর, মুগদা (ঢাকা) এবং আর্মড ফোর্সেস মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে পিসিআর ল্যাব স্থাপন এবং সংশ্লিষ্ট ডাক্তার ও টেকনোলজিস্টদের ট্রেনিং দিয়েছেন। কিন্তু ২/৪ দিনের একটি শর্ট ট্রেনিং এর মাধ্যমে আরটি-পিসিআর পদ্ধতি সম্পর্কে সম্যক ধারণা দেয়া সম্ভব নয়। কেননা আরটি-পিসিআরএমন একটি উন্নত প্রযুক্তি যার প্রতিটি ধাপ (স্যাম্পল সংগ্রহ, সংরক্ষণ, পরিবহন, আরএনএ এক্সট্রাকশন, আরএনএ কন্টামিনেশন রোধ করা, মেশিন চালনা, বায়ো সেফটি লেভেল নিশ্চিতকরণ, ফলাফল বিশ্লেষণ ইত্যাদি) এতই সুক্ষ্ম ও স্পর্শকাতর যে এর কোনো একটিতে সামান্য ভুলে সঠিক টেস্ট রিপোর্ট পাওয়া যাবে না।
রিপোর্ট সঠিক না হলে সঠিক চিকিৎসা দেয়া সম্ভব হবে না এবং সংক্রমণের হার দ্রুত বৃদ্ধি পাবে বলে তারা দাবি করেন। এজন্য করোনা প্রতিরোধে মলিকুলার বায়োলজিস্টদের বিশাল ভূমিকা থাকার পরও ১৮ এপ্রিল গঠিত ১৭ সদস্য বিশিষ্ট জাতীয় পরামর্শক কমিটিতে বায়োকেমিস্ট এবং মলিকুলার বায়োলজিস্ট কাউকে রাখা হয়নি।
বাংলাদেশে কোভিড-১৯ এর সংক্রমণ ও বর্তমান অবস্থার প্রেক্ষিতে আরটি-পিসিআর বিশেষজ্ঞ হিসেবে বায়োকেমিস্ট এবং মলিকুলার বায়োলজিস্টদের করণীয় নির্ধারণ বিষয়ে গত ২২ এপ্রিল জিবিএ-এর উদ্যোগে মলিকুলার বিজ্ঞানীদের সাথে ভিডিও কনফারেন্সিং এর মাধ্যমে একটি আলোচনা সভা করা হয়। সভায় দেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় হতে বায়োকেমিস্ট্রি অ্যান্ড মলিকুলার বায়োলজিতে মাস্টার ডিগ্রিধারী গবেষকগণও সংযুক্ত ছিলেন।
অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি প্রফেসর ড. হোসেন উদ্দিন শেখর এর সভাপতিত্বে এবং জেনারেল সেক্রেটারি আবু সাঈদ মুহাম্মদ শামীম এর সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত উক্ত আলোচনা সভায় উপস্থিত ছিলেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি ও বিজ্ঞানী প্রফেসর ড. আনোয়ার হোসেন, আন্তর্জাতিক খ্যাতনামা বিজ্ঞানী ড. ফেরদৌসী কাদরী, যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি প্রফেসর ড. আনোয়ার হোসেন, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি প্রফেসর ড. ইমরান কবির চৌধুরী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োকেমিস্ট্রি অ্যান্ড মলিকুলার বায়োলজি বিভাগের প্রফেসর ড. হাসিনা খান, জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড বায়োটেকনোলজি বিভাগের প্রফেসর ড. শরিফ আখতারুজ্জামান, বায়োকেমিস্ট্রি অ্যান্ড মলিকুলার বায়োলজি বিভাগের চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. জেবা ইসলাম সেরাজ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োকেমিস্ট্রি অ্যান্ড মলিকুলার বায়োলজি বিভাগের চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. তানজিমা ইয়াসমিন, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োকেমিস্ট্রি অ্যান্ড মলিকুলার বায়োলজি বিভাগের চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. নুরুল করিম ও প্রবাসী বাংলাদেশি বিজ্ঞানী ড. রুবায়েত হাসান তানভী সহ সংগঠনের সদস্যরা।
সভায় ড. আনোয়ার হোসেন বলেন, বর্তমানে করোনা প্রতিরোধ একটি যুদ্ধ। বিশ্বব্যাপী এই যুদ্ধে যারা এখন পর্যন্ত সফলতা দেখিয়েছে তাদের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগাতে হবে। তিনি বলেন, এই যুদ্ধে বিশ্বের অন্যান্য দেশের ন্যায় বাংলাদেশেও একটি সমন্বিত কার্যক্রম দরকার যাতে চিকিৎসকদের পাশাপাশি গবেষকদের কাজ করার সুযোগ থাকবে।
বিশিষ্ট ভ্যাকসিন গবেষক ও আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানী ড. ফেরদৌসি কাদরী বলেন, বর্তমানে যে টেস্ট করা হচ্ছে তার কোয়ালিটি কন্ট্রোল করা প্রয়োজন। কিন্তু দেখা যাচ্ছে কয়েকদিন পরপর টেস্ট কিট পরিবর্তন করা হচ্ছে। ভিটিএম এর পরিবর্তে নরমাল স্যালাইনে স্যাম্পল সংরক্ষণ করা হচ্ছে যা স্যাম্পলের গুণগত মান কমিয়ে দিচ্ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে পত্র দেয়ার পরও কোনো জবাব না পাওয়া এবং জাতীয় পরামর্শক কমিটিতে বায়োকেমিস্ট ও মলিকুলার বায়োলজিস্ট কাউকে না রাখা দুঃখজনক বলে ড. শরিফ আখতারুজ্জামান তাঁর বক্তব্যে উল্লেখ করেন।
কাতারে কর্মরত আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ভাইরোলজিস্ট ড. রুবায়েত হাসান তানভী বলেন, তারা ভাইরাসটির জিনোম সিকোয়েন্স করে প্রয়োজনীয় টেস্ট কিট তৈরি করে নিয়েছেন। তিনি আরো উল্লেখ করেন, সরকারের সহযোগিতা পেলে বাংলাদেশের মলিকুলার বিজ্ঞানীরাও টেস্ট কিট তৈরি করতে পারেন।
সরকারি সহযোগিতায় ভিটিএম তৈরি ও ভাইরাসটির জিনোম সিকোয়েন্স করে প্রয়োজনীয় টেস্ট কিট তৈরি করা সম্ভব বলে সভায় বক্তারা উল্লেখ করেন।
প্রফেসর ড. হোসেন উদ্দিন শেখর উল্লেখ করেন, সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে জিবিএ প্রাথমিকভাবে ৭০ জন এবং ২য় ধাপে আরো ৮০ জন গ্রাজুয়েট বায়োকেমিস্ট এবং মলিকুলার বায়োলজিস্টকে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে করোনা শনাক্তকরণ পরীক্ষার সাথে যুক্ত হওয়ার জন্য নির্দিষ্ট করেছে। এই সকল বায়োকেমিস্ট এবং মলিকুলার বায়োলজিস্টদের চার দিন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা অনুসরণে কীভাবে পিসিআর ল্যাবে কাজ করতে হবে এবং অন্যান্য দেশে কীভাবে কাজ করা হচ্ছে সে বিষয়ে অন-লাইনে ট্রেনিং দেয়া হচ্ছে মর্মেও তিনি সভায় জানান।
সার্বিক আলোচনা শেষে সভায় কিছু সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। তার মধ্যে রয়েছে-
* প্রাথমিকভাবে নির্দিষ্টকৃত ৭০ জন এবং দ্বিতীয় ধাপে ৮০ জন গ্র্যাজুয়েট বায়োকেমিস্ট এবং মলিকুলার বায়োলজিস্টদের ট্রেনিং প্রোগ্রামটি যথাসময়ে শুরু ও শেষ করতে হবে। পাশাপাশি আরো গ্রাজুয়েট বায়োকেমিস্ট এবং মলিকুলার বায়োলজিস্টদের ট্রেনিং প্রদান করে দেশের কাজে এগিয়ে আসার জন্য অনুপ্রাণিত করতে হবে।
* প্রশিক্ষিতত এই বায়োকেমিস্ট এবং মলিকুলার বায়োলজিস্টদেরকে কাজে লাগানোর জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে পুনরায় পত্র প্রদান করা হবে। প্রয়োজনে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়েও পত্র প্রদান করা হবে।
* বিশ্বের অন্যান্য দেশের ন্যায় বাংলাদেশেও জাতীয় পরামর্শক কমিটিতে বায়োকেমিস্ট এবং মলিকুলার বায়োলজিস্ট, মহামারি বিশারদ, ভ্যাকসিন গবেষক ও অর্থনীতিবীদকে অন্তর্ভুক্তের জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে পত্র প্রদান করা হবে।
* সরকারি সহযোগিতায় বায়োকেমিস্ট এবং মলিকুলার বায়োলজিস্টগণ ভিটিএম তৈরি ও ভাইরাসটির জিনোম সিকোয়েন্স করে প্রয়োজনীয় টেস্ট কিট তৈরি করা সম্ভব।
নগরকন্ঠ.কম/এআর